ডেস্ক নিউজ : জাতীয় সংসদের পর এবার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এ নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। যদিও ১১ সিটি করপোরেশন ও ৪২ জেলা পরিষদে বর্তমান সরকারদলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় ক্ষোভের পাশাপাশি এ নির্বাচন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে স্থানীয় নির্বাচনের দাবি জোরদারের পাশাপাশি প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিচ্ছে জামায়াত।
১১ দলীয় ঐক্যের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। জোটের আরো কয়েকটি দলের একই ধরনের প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারের প্রায় সব পদে জামায়াতের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের এলাকায় সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডসহ নানাভাবে গণসংযোগ চালাচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্যরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিশূন্যতা বিরাজ করছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তাই জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি ছিল জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের। তবে বিএনপির বিরোধিতায় অন্তর্বর্তী সরকার সে দাবি আমলে নেয়নি। স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন দেবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন পদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় সে আশাও ভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টির কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত করে দলীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এটা সংবিধানবিরোধী বলে মন্তব্য করে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে দলটি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখন একক দলগতভাবে প্রার্থী ঠিক করা হবে। পরে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হলে সে অনুযায়ী পরিবর্তন করা হবে।
তিনি আরো জানান, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তীতে আমরা জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলাম। সেভাবে আমাদের প্রস্তুতিও নেওয়া শুরু হয়েছিল। সে প্রস্তুতির সঙ্গে যোগ-বিয়োগ করে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
সূত্রমতে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্য করে অংশ নেয় জামায়াতে ইসলামী। এতে জামায়াতের ৬৮টি, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে বিজয়ী হয়। নির্বাচন-পরবর্তী ৭৭টি আসন নিয়ে জোটগতভাবে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জামায়াত।
জামায়াতের মতো জোটের আরো কয়েকটি দল তাদের মতো করে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এনসিপির পক্ষ থেকে পাঁচ মেয়রপ্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, স্থানীয় নির্বাচন জোটগতভাবে করার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় নির্বাচনকে দ্বিতীয় লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ঈদের আগে সিলেটে দলীয় অনুষ্ঠানে নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রথম লড়াই ছিল জাতীয় নির্বাচন আর দ্বিতীয় লড়াই শুরু হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। এ লড়াইয়ে একটি জায়গাও যেন আমাদের খালি না থাকে। গত ২৫ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভায় তিনি সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের তীব্র সমালোচনা করে নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সূত্রমতে, স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় গত ১ মার্চ অনুষ্ঠিত জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়। তখন এ নির্বাচনের জন্য সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুতি নিতে দায়িত্বশীলদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী কাজ চালাচ্ছেন তারা।
জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, তৃণমূলের মতামত নিয়ে নির্ধারিত নিয়মানুযায়ী জনপ্রিয় প্রার্থীকে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী করা হবে। এক্ষেত্রে মেয়র প্রার্থী ঠিক করবেন কেন্দ্রীয় নেতারা। উপজেলা পরিষদের জন্য প্রার্থী ঠিক করবেন দলের আঞ্চলিক দায়িত্বশীলরা। ইউনিয়ন পর্যায়ের জন্য জেলা শাখা থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
ঢাকার দুই সিটিতে কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে জামায়াত। ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের সংরক্ষিত মহিলাসহ প্রায় সব কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে দলটি। তারা নিজ নিজ এলাকায় শুভেচ্ছা পোস্টারিংসহ বিভিন্ন তৎপরতাও চালাচ্ছেন। তবে মেয়র পদে এখনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। তবে সম্ভাব্যরা তাদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, নির্বাচন কবে হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য জামায়াত প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে ৭৫টির মধ্যে ৭০ জনের মতো কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ চালাচ্ছেন। তবে মেয়র পদে কেন্দ্র থেকে এখনো কাউকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। এই সিটি এলাকার সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে কেউ প্রার্থী হতে পারেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
একই ধরনের মন্তব্য করে ঢাকা উত্তর জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মুসা জানান, এই সিটির অধিকাংশ কাউন্সিলর প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তারা ঈদের আগে পোস্টার ছাপিয়ে জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেয়র পদে এখনো প্রার্থী ঘোষণা না করা হলেও আগের প্রার্থী হিসেবে মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইতোমধ্যে তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনসেবামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এর আগে ২০১৮ সালেও উত্তর সিটির মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি।
আর আই খান