বাড়ি » ভোট-পরবর্তী অশান্তির মেঘ পশ্চিমবঙ্গে, মমতার বাড়ির সামনে সেনা

ভোট-পরবর্তী অশান্তির মেঘ পশ্চিমবঙ্গে, মমতার বাড়ির সামনে সেনা

May 4, 2026

আর্ন্তজাতিক নিউজ ডেস্ক:

২০২৬ সালের ৪ মে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় ও রক্তক্ষয়ী পট পরিবর্তনের সাক্ষী থাকল। ভোট গণনার প্রাথমিক প্রবণতা থেকেই এটা স্পষ্ট যে, দেড় দশকের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি এক ঐতিহাসিক ও ঝোড়ো জয়ের পথে এগিয়ে চলেছে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজেপি ১৯২টি আসনে এগিয়ে থেকে ম্যাজিক ফিগার অতিক্রম করেছে, যেখানে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৯৭টি আসনে থমকে আছে।

তবে এই পরিবর্তনের আবহে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত। গেরুয়া শিবির জয়ের গন্ধ পেতেই বিভিন্ন জায়গায় বিজয় উল্লাসের পাশাপাশি শাসকদলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ সামনে আসছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনের সামনে কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়েছে নির্বাচন কমিশন।

এই নির্বাচনি ফলাফলের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই জয় আসলে সুপরিকল্পিত মেরুকরণের ফল। তার দাবি অনুযায়ী, একদিকে যেমন তারা রাজ্যের হিন্দু ভোট এক ছাতার তলায় আনতে সফল হয়েছেন, অন্যদিকে তৃণমূলের চিরাচরিত তুরুপের তাস ‘মুসলিম ভোট ব্যাংক’ এবার পুরোপুরি ধসে গেছে। এই হিন্দু ভোটের অভূতপূর্ব সংহতি উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল পর্যন্ত বিজেপিকে একতরফা লিড এনে দিয়েছে। সন্দেশখালী ইস্যু থেকে শুরু করে সিএএ কার্যকর হওয়া—সবই হিন্দু ভোটারদের মনে নিরাপত্তার প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছিল, যা ব্যালট বাক্সে বিজেপির পক্ষে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে বাম ও কংগ্রেসের ভোট শেয়ার সামান্য বাড়ায় অনেক আসনেই তৃণমূলের ভোট ভাগ হয়ে গেছে, যা পরোক্ষভাবে গেরুয়া শিবিরের জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।

তৃণমূলের এই পরাজয়ের নেপথ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোহভঙ্গ একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে আইনি জটিলতা এবং মুসলিম ওবিসি সার্টিফিকেট বাতিলের জেরে লাখ লাখ কর্মপ্রার্থী যুবকের ক্ষোভ শাসকদলের বিরুদ্ধে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ। রাজ্যের মুসলিম ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবার তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়ে আইএসএফ কিংবা বাম-কংগ্রেস জোটের দিকে ঝুঁকেছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ বা উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোতে এই ভোট বিভাজন তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, সরকার সংখ্যালঘুদের কেবল ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করায় এবং তাদের দাবিদাওয়ার চেয়ে দমনমূলক নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এই বিদ্রোহ তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ পড়ার বিষয়টিও এই ফলাফলে গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোতে যেখানে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি ছিল, সেখান থেকেই সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গেছে। এই প্রশাসনিক রদবদল তৃণমূলের ভোটের অঙ্ক গোড়া থেকেই এলোমেলো করে দিয়েছিল। এর পাশাপাশি শিক্ষা ও রেশন বণ্টনের মতো একাধিক নিয়োগ দুর্নীতি এবং শীর্ষ নেতাদের জেলযাত্রা মানুষের মনে সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছিল। রেকর্ড ৯২ শতাংশের বেশি ভোটদানই প্রমাণ করেছিল যে মানুষ এবার পরিবর্তনের লক্ষ্যে মরিয়া ছিলেন। হিন্দু ভোটের মেরুকরণ এবং মুসলিম ভোটের ভাঙন—এ দুই বিপরীতমুখী স্রোতের আবর্তে পড়ে শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় দুর্গ আজ ধূলিসাৎ হওয়ার পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো দেখুন