অর্থনীতি ডেস্ক:
৫ আগস্ট, ২০২৪ ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেরিয়ে আসে ব্যাংক খাতের ক্ষতচিহ্ন। প্রকাশ পেতে থাকে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত চিত্র
চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমসহ হাসিনার আশীর্বাদপুষ্ট অসংখ্য ব্যক্তি এবং ব্যবসায়ী গ্রুপ ঋণের নামে ব্যাংকগুলো থেকে অনৈতিক উপায়ে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ কোটি টাকা। ফলে প্রায় এক ডজনেরও বেশি ব্যাংক আর্থিকভাবে চরম রুগ্ন হয়ে পড়ে। সীমাহীন খেলাপি ঋণ এবং মূলধন ঘাটতির কারণে ভয়াবহ তারল্য সংকটে পড়ে ব্যাংকগুলো।
শেখ হাসিনা পালানোর পর অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু পদক্ষেপে ব্যাংক খাতের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসলেও সম্প্রতি অনেকের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৬ পাস হওয়ার পর থেকে এমন আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে শর্ত-সাপেক্ষে এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাওয়ার খবরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এস আলম গ্রুপ আবার ফিরছে- এই খবরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে আমানতের টাকা তুলে নেওয়ারও প্রবণতা শুরু হয়েছে। এসব গ্রাহকদের ভাষ্য, এস আলম ফিরলে ব্যাংক খাতের অবস্থা আগের মতোই হতে পারে। এতে তারা টাকা ফেরত নাও পেতে পারেন, এজন্য তারা টাকা তুলে নিচ্ছেন।
মুনিরা শাহরিন নামে একজন গ্রাহক বলেন, “শুনছি নতুন ব্যাংক আইন পাস হইছে। এস আলম নাকি আবার ব্যাংকের মালিকানায় আসবে, এই জন্য টাকা তুলে নেওয়ার চিন্তা করছি। এর আগে অনেক ভোগান্তি পোহাইতে হইছে।”
ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের রুগ্ন ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫’। এর উদ্দেশ্য ছিল যেসব ব্যাংক লুটপাট ও অব্যবস্থাপনায় দেউলিয়া হয়েছে, সেগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং যারা এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী, তাদের চিরতরে মালিকানা থেকে সরিয়ে দেওয়া। তবে নতুন সংশোধিত ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৬’ অনুযায়ী, রেজুলেশন বা একীভূতকরণের আওতায় যাওয়া কোনো ব্যাংকের তালিকাভুক্তির আগে থাকা শেয়ারহোল্ডাররা চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় গ্রহণ করতে পারবেন।
এস আলমের দখলকৃত ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা
এস আলমের দখলকৃত ব্যাংকগুলোর বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণও আকাশছোঁয়া। ব্যাংকগুলো থেকে এস আলম ও তার সহযোগীরা নামে-বেনামে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। আত্মসাতকৃত এই অর্থের বেশিরভাগই বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি প্রায় ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ১৭ শতাংশে, ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপির হার ৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫১ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫২ শতাংশের বেশি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের হাতে।
এছাড়া দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক- ইসলামী ব্যাংক পিএলসিও দখলে ছিলো আলোচিত এই গ্রুপটির। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণ ছিল ১ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকের মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি এখন অনাদায়ী।
আত্মসাতকৃত টাকার বেশিরভাগই বিদেশে পাচার
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এখন পর্যন্ত এস আলম গ্রুপের ব্যাংকিং খাতে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়। এই গ্রুপের পাচারের বড় মাধ্যম ছিল ভুয়া এলসি। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে বিদেশে গ্রুপটির ব্যাংক হিসাবে এসব অর্থ স্থানান্তর করা হয়। অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির জন্য ঋণ নিয়ে ইসলামী ব্যাংকে এলসি খোলা হয়। এলসির আওতায় পণ্য দেশে না এনে ১৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার করেন গ্রুপের কর্ণধার এস আলম মাসুদ। পরে ইসলামী ব্যাংক ওই অর্থ গ্রাহকের (এস আলম গ্রুপ) নামে ফোর্স লোন তৈরি করে বিদেশের নেগোশিয়েটিং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করে। কিন্তু এলসি ওপেন করা ঋণগ্রহীতারা বিপুল অঙ্কের এই টাকা পরিশোধ না করায় পুরো ১৮ হাজার কোটি টাকাই এখন খেলাপি। এর বাইরেও তিনি অফশোর ব্যাংকিংয়ের আওতায় আরও অর্থ পাচার করেন।
এস আলম গ্রুপের দখল করা ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে পর্ষদের অনুমোদন না নিয়েই লাখ কোটি টাকার বেশি সরিয়ে নেওয়া হয়। এসব অর্থ বিদেশে এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের একটি শাখা থেকেই এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসির আড়ালে এসব ঋণের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।##
এমকে