স্থান :

/

/

বাড়ি » ডেফারেল সুবিধা নিয়ে মুনাফায় ১১ ব্যাংক, লোকসানে ৮টি

ডেফারেল সুবিধা নিয়ে মুনাফায় ১১ ব্যাংক, লোকসানে ৮টি

May 11, 2026

অর্থ ও বানিজ্য সংবাদঃ

দেশের ব্যাংক খাতে গত বছর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ কারণে অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এ অবস্থায় ১৯টি ব্যাংককে দুই লাখ ৬৩ হাজার ২১০ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সুবিধা নিয়ে ১১টি ব্যাংক কৃত্রিমভাবে মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। মুনাফা দেখালেও এসব ব্যাংক অবশ্য লভ্যাংশ দিতে পারেনি। অন্যদিকে ডেফারেল সুবিধা পেয়েও আটটি ব্যাংক বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোকে ডেফারেল সুবিধা দেওয়া হয়, যাতে বছর শেষে তারা আর্থিক প্রতিবেদন তুলনামূলক ভালো দেখাতে পারে। যদিও এ সুবিধা এক বছরের জন্য দেওয়া হয়, বাস্তবে অধিকাংশ ব্যাংকই কোনো বছর সেই ঘাটতি সমন্বয় করতে পারেনি। বছরের পর বছর এ ধারা চলছে। এই সুবিধা না পেলে ব্যাংকগুলোর মূলধনের ওপর চাপ বাড়ে এবং অন্যান্য সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, ঋণের মানভেদে শূন্য দশমিক ২৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যাংক তা সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে ঘাটতির অর্থ ব্যাংকের মূলধন থেকে সমন্বয় করা হয়। ফলে মূলধন কমে যায়। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো প্রভিশন ঘাটতি রেখে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দিতে পারে না। এ দুই সমস্যা এড়াতে দীর্ঘদিন ধরে ডেফারেল সুবিধা ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো মুনাফা দেখিয়ে লভ্যাংশ দিয়ে আসছিল। ২০২৩ সালের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে ১৬টি ব্যাংক এই সুবিধা নিয়ে লভ্যাংশও দিয়েছিল। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সেই সুযোগ বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানা গেছে, প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়ে যেসব ব্যাংক ডেফারেল সুবিধা নিয়েছে, তারা ২০২৪ সালের জন্য কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণাসংক্রান্ত নতুন নীতিমালাও জারি করে। সেখানে বলা হয়, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি, তারা কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না। এই সিদ্ধান্ত ২০২৫ সমাপ্ত বছর থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে গত বছর প্রায় ৩৪ ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারেনি।

ডেফারেল সুবিধা নিয়ে মুনাফায় ১১ ব্যাংক

প্রভিশন ঘাটতির বিপরীতে ডেফারেল সুবিধা নিয়ে ১১টি ব্যাংক নিট মুনাফা দেখিয়েছে। জানা গেছে, গত বছর রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের রূপালী ব্যাংক ১৪ হাজার ১৪ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা পেয়েছে। এরপর ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়েছে ছয় কোটি টাকা। আগের বছর মুনাফা ছিল ১১ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকও ডেফারেল সুবিধা নিয়ে মুনাফা দেখিয়েছে। ব্যাংকটি ১৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার সুবিধা পাওয়ার পর ২০২৫ সালে ৫৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ৯২৫ কোটি টাকা।

ইসলামী ব্যাংক ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ৮৮ হাজার কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা পেয়েছে। অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিপুল পরিমাণ সুবিধা নেওয়ার পরও ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়েছে মাত্র ১৩৬ কোটি টাকা। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক চার হাজার ৯৯৮ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা নিয়ে ২০২৫ সালে ৮৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। আগের বছর ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৭৬ কোটি টাকা। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক তিন হাজার ৮৪৫ কোটি টাকার সুবিধা পেয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৮২ কোটি টাকা থেকে কিছুটা কম।

এছাড়া মার্কেন্টাইল ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতির বিপরীতে দুই হাজার ১৬১ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা পেয়েছে। সুবিধা নেওয়ার পর ২০২৫ সালে ব্যাংকটির মুনাফা হয়েছে ১২২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এ মুনাফা ছিল ৬৪ কোটি টাকা। এনআরবিসি ব্যাংক এক হাজার ছয় কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা পাওয়ার পর নিট মুনাফা হয় ১৩ কোটি টাকা। সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংক এক হাজার ২৩ কোটি টাকার সুবিধা নিয়ে গত বছর নিট মুনাফা হয়েছে মাত্র ৭০ লাখ টাকা। আগের বছর মুনাফা ছিল ১১ কোটি টাকা। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পাঁচ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা নিয়ে ২০২৫ সালে ২৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তা ছাড়া এনআরবি ব্যাংক গত বছর ১৮০ কোটি টাকা সুবিধা নিয়ে ১৩ কোটি টাকা এবং ওয়ান ব্যাংক এক হাজার ২০২ কোটি টাকা ডেফারেল নিয়ে ২১ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

সুবিধা নিয়েও বড় লোকসানে ৮ ব্যাংক

এদিকে ডেফারেল সুবিধা পেয়েও আটটি ব্যাংক লোকসানে পড়েছে। জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ৫০ হাজার ৯৪২ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা পেয়েও ২০২৫ সালে তিন হাজার ৯৩১ কোটি টাকা লোকসান করেছে। ২০২৪ সালে লোকসান ছিল তিন হাজার ৬৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান আরো বেড়েছে। ব্যাংকটির বড় অংশের খেলাপি ঋণ রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে। ওই গ্রুপ থেকে ঋণের অর্থ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটির লোকসান বাড়ছে। বেসিক ব্যাংক পাঁচ হাজার ৮২ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা নিয়েও ২০২৫ সালে ৮১০ কোটি টাকা লোকসান করেছে। আগের বছর লোকসান ছিল ৮৬৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ২২৫ কোটি টাকা ডেফারেল সুবিধা পাওয়ার পরও ৭০ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে। এছাড়া বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক ১৬ হাজার ২৯০ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা পেয়েও ২০২৫ সালে তিন হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির লোকসান ছিল এক হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। আইএফআইসি ব্যাংক ২১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা নিয়ে ২০২৫ সালে দুই হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে। ন্যাশনাল ব্যাংক ১৮ হাজার ৬০৮ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা নেওয়ার পরও দুই হাজার ৪২৯ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে। আগের বছর লোকসান ছিল এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা পেয়েও ১২৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক এক হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ডেফারেল সুবিধা নিয়ে ৪৭৯ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক খাতে প্রকৃত প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ আরো বেশি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিগত সুবিধার কারণে তা কম দেখানো যাচ্ছে। তিনি বলেন, ডেফারেল সুবিধা না দিলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি আরো বাড়বে। মূলধন কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়ে যায়। কারণ বিদেশি ব্যাংকগুলো মূলধনের সক্ষমতা বিবেচনায় বাণিজ্য করে। মূলধনে ঘাটতি থাকলে বাণিজ্য অর্থায়নের খরচও বেড়ে যায়।

এম কে

টপিক :

স্থান :

/

/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো দেখুন